Saturday, 10 September 2016


আসরের ওয়াক্ত শুরু। সবাইকে নামাজ পড়তে হবে। অজুর জন্য পানির প্রয়োজন। কিন্তু পানি পাওয়া যাচ্ছে না।নবীজীর(সাঃ) সামনে একটি পাত্রে সামান্য একটু পানি যা দিয়ে একজনের অজুও হয় না। সাহাবীদের সংখ্যা অনেক। নবীজী(সাঃ) তাঁর সামনে রাখা পাত্রের পানিতে তদীয় পবিত্র হস্ত মুবারক রাখলেন।আর ততক্ষনাৎ তাঁর আংগুলের ফাক দিয়ে পানি উথলে উঠা শুরু করল। নবীজী(সাঃ) সবাইকে দ্রুত অজু সেরে নিতে বললেন। সবাই অজু করলেন। শেষে নবীজীও করলেন। হাদীসের বর্ণনায়----
একঃ
আবদুল্লাহ ইব্‌ন ইউসুফ (রঃ).....আনাস ইব্‌ন মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সাঃ) কে দেখলাম, তখন আসরের সালাতের সময় হয়ে গিয়েছিল। আর লোকজন উযূর পানি তালাশ করতে লাগল কিন্তু পেল না। তারপর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) পাত্রে তাঁর হাত রাখলেন এবং লোকজনকে তা থেকে উযূ করতে বললেন। আনাস (রাঃ) বলেন, সে সময় আমি দেখলাম, তাঁর আঙ্গুলের নীচ থেকে পানি উথলে উঠছে। এমনকি তাদের শেষ ব্যক্তি পর‌্যন্ত তা দিয়ে উযূ করল। (বুখারী শরীফ ১ম খন্ড, ১৭০ নং হাদিস, ইফা)
দুইঃ
‘আবদুল্লাহ ইব্‌ন মুনীর (রঃ)..... আনাস ইব্‌ন মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ একবার সালাতের সময় উপস্থিত হলে যাঁদের বাঢ়ী নিকটে ছিল তাঁরা (উযূ করার জন্য) বাড়ী চলে গেলেন। আর কিছু লোক রয়ে গেলেন (তাঁদের কোন উযূর ব্যাবস্থা ছিল না)। তখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর জন্য পাথরের পাত্রে পানি আনা হল। পাত্রটি এত ছোট ছিল যে, তার মধ্যে তাঁর উভয় হাত মেলে দেওয়া সম্ভব ছিল না। তা থেকেই কওমের সকল লোক উযূ করলেন। আমরা জিজ্ঞাসা করলামঃ ‘আপনারা কতজন ছিলেন’? তিনি বললেনঃ ‘আশিজন বা আরো বেশী। (বুখারী শরীফ ১ম খন্ড, ১৯৫ নং হাদিস, ইফা)

হযরত আবু বকর (রাঃ) অসুস্থ ???


মুহাম্মদ ইবনুল মুনকাদির বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) অসুস্থ আবু বকর (রাঃ)-কে দেখতে গেলেন। তখন তিনি সেখান থেকে বের হয়ে হযরত আয়েশা (রাঃ)-র কাছে তাশরীফ নিলেন। উদ্দেশ্য, তাঁকে তাঁর পিতার অসুস্থতার সংবাদ দেওয়া। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ঘরে প্রবেশ করা মাত্র হযরত আবু বকর (রাঃ) দরজার বাইরে থেকে ভিতরে প্রবেশ করার অনুমতি চাইলেন। হযরত আয়েশা (রাঃ) বললেন, আব্বাজান দেখি তাশরীফ নিয়ে এসেছেন। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) খবই আশ্চর্য প্রকাশ করতে লাগলেন যে, আল্লাহ্ পাক এত দ্রুত তাকে আরোগ্য দান করেছেন। হযরত আবু বকর (রাঃ) আরয করলেন, হুজুর! আপনি বের হওয়া মাত্রই হযরত জিব্রাইল (আঃ) আগমন করলেন এবং আমাকে একটি ঔষুধ শুঁকালেন, আর সাথে সাথে আমি সুস্থ হয়ে উঠলাম।
ইবনে আবুদ্দিনার ও ইবনে আসাকিরও এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন।
[তথ্যসূত্রঃ মাকামে সাহাবা ও কারামতে সাহাবা]

Thursday, 8 September 2016

স্বপ্ন তিন প্রকার


আমরা ঘুমালে অনেক কিছু স্বপ্নে দেখি। কখনওবা আনন্দদায়ক স্বপ্ন, কখনওবা কষ্টদায়ক স্বপ্ন, আবার কখনওবা ভীতিকর স্বপ্ন দেখি। কিন্তু স্বপ্নের অর্থ আমরা বুঝি না। কোন্ স্বপ্ন দেখলে কি করতে হবে তাও আমরা জানি না। এ সম্পকে আমাদের প্রিয় নবীজী(সাঃ) যে দিক-নিদেশনা দিয়েছেন তা নীচে তুলে ধরা হলো।

আবু বাকর ইব্‌ন আবু শায়বা (রঃ).…আবু হুরায়রা (রাঃ) সূত্রে নবী (সাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ স্বপ্ন তিন প্রকার।
(১) আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ,
(২)মনের খেয়াল, আর
(৩) শয়তানের পক্ষ থেকে ভীতি প্রদর্শন।
কাজেই তোমাদের কেউ কোন পসন্দনীয় জিনিস স্বপ্নে দেখলে তা ইচ্ছা করলে অন্যের কাছে বলতে পারে। আর কেউ কোন অপসন্দীয় জিনিস স্বপ্নে দেখলে তা কারো কাছে বলবে না, আর সে যেন উঠে সালাত আদায় করে। (সুনানে ইবনে মাজাহ্, হাদিস নং-৩৯০৬, ই,ফা)

স্বপ্ন তিন প্রকার
অন্য এক বণনায়ঃ
হিশাম ইব্‌ন আম্মার (রঃ)…আওফ ইব্‌ন মালিক (রাঃ) সূত্রে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ স্বপ্ন তিন প্রকারঃ
(এক) শয়তানের পক্ষ থেকে ভীতিজনক স্বপ্ন যা বনী আদমকে চিন্তাগ্রস্ত করে।
(দুই) মানুষ জাগ্রত অবস্থায় যা দেখলে চিন্তাযুক্ত হয়, স্বপ্নে তা দেখা।
(তিন) স্বপ্ন হলো নবুওয়াতের ছেচল্লিশ ভাগের এক ভাগ।
রাবী বলেন, আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলামঃ আপনি কি এ হাদীস রাসূলুল্লাহ (সাঃ) থেকে শুনেছেন? তিনি বললেনঃ হাঁ, আমি তা রাসূলুল্লাহ (সাঃ) থেকে শুনেছি।(সুনানে ইবনে মাজাহ্, হাদিস নং-৩৯০৭, ই,ফা)
কেউ অপসন্দনীয় স্বপ্ন দেখলে-
মুহাম্মদ ইব্‌ন রুম্হ আল-মিসরী (রঃ)….জাবির ইব্‌ন আবদুল্লাহ (রাঃ) সূত্রে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ যখন তোমাদের কেউ অপসন্দনীয় স্বপ্ন দেখে তখন সে যেন তার বাম দিকে তিনবার থুথু ফেলে, তিনবার আল্লাহর কাছে শয়তান থেকে পানাহ চায়(‘‘আউযূ বিল্লাহি মিনাশ শায়তানির রাজীম” পড়ে)এবং সে যে পাশে কাৎ হয়ে শুয়ে ছিল তা যেন পরিবর্তন করে নেয়। (সুনানে ইবনে মাজাহ্, হাদিস নং-৩৯০৮, ই,ফা)

Monday, 29 August 2016

নবীজী(সাঃ)কে মেঘের ছায়া প্রদান


চাচা আবূ তালিব বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে সিরিয়ায় যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলেন। সে সয়ম দাদা আবদুল মুত্তালিব গত হয়েছেন। বালক রাসূলুল্লাহ্ (সা) চাচার পরিবারভুক্ত হয়ে আছেন।
আবূ তালিব যখন রওয়ানা হবেন, চাঁদের মত সুন্দর বালক মুহাম্মদ (সা) এসে আবূ তালিবের জামার আস্তিন ধরে দাঁড়ালেন। ভাতিজার দিকে চেয়ে তিনি বললেনঃ ওকে ছাড়া আমি থাকতে পারব না, আমাকে ছাড়া সেও থাকতে পারবে না। ওকে আমার সাথে নিয়ে যেতে হবে। রাসূলুল্লাহ্ (সা) এভাবে আবূ তালিবের বাণিজ্য কাফেলার অন্তভুক্ত হলেন।
সিরিয়ার বুসরা একটি বিখ্যাত এলাকা। অন্যানা বারের মত কাফেলা এখানে যাত্রাবিরতি করল। এখানকার বিখ্যাত খৃস্টান গির্জায় বাহিরা নামক একজন সাধক পাদ্রী থাকতেন। এ বিশাল এলাকার লোকজন ধর্মজ্ঞান ও সাধনার জন্য তাঁর প্রতি খুবই শ্রদ্ধাশীল ছিল। এ গির্জায় দীর্ঘদিনের পুরানো এক আসমানী গ্রন্থ রক্ষিত ছিল। সে যুগে এটিকেই একমাত্র ঐশী জ্ঞানের আধার বলে মনে হতো।
সাধক বাহিরার বৈশিষ্ট ছিল, তিনি লোকসমক্ষে বের হতেন না। কথাবার্তাও বলতেন না। এবার মক্কায় এ কাফেলা যখন এ গির্জার অনতিদূরে যাত্রাবিরতি করল, আশ্চার্যজনকভাবে বাহিরা এ কাফেলার জন্য আপ্যায়নের প্রচুর ব্যবস্থা করলেন। প্রকৃত ব্যাপার ছিল, প্রচন্ড রোদের ভিতর দিয়ে এ কাফেলা যখন গির্জার দিকে এগিয়ে আসছিল, বাহিরা তখন অলস চোখে সেদিকে তাকিয়েছিলেন। হঠাৎ তিনি একটি অত্যাশ্চার্য দৃশ্য দেখে চমকে উঠলেন। তিনি দেখলেন, একখন্ড ঘন মেঘ কাফেলার মধ্যকার অনিন্দ্য সুন্দর এক কিশোরের উপর ছায়া বিস্তার করে সাথে সাথে আসছে। অবাক হয়ে বাহিরা গভীর মনোযোগের সাথে তা দেখতে লাগলেন।
কাফেলা যখন গির্জান কাছে একটি বড় বৃক্ষের নিচে ক্যাম্প করল, গাছের একটি শাখা ইষৎ নত হয়ে ঐ কিশোরের উপর পরিপূর্ণ ছায়া দান করে স্থির হয়ে রইল। ঐ চলন্ত মেঘ খন্ডটিও তাঁর উপর স্থির হয়ে থাকল। বাহিরা ভোজের আয়োজন করলেন। বাহিরা তাঁর সুদীর্গকালের নিয়ম ভেঙে গির্জা থেকে বের হয়ে এলেন এবং লোক পঠিয়ে কাফেলার লোকদের দাওয়াত করলেন। বলে পাঠালেন, আমি আপনারদের ছোট-বড়, আযাদ-গোলাম সকলেই এ ভোজে শামিল হওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। আমার এখানে খাদ্যগ্রহণ করে আপনারা আমাকে বাধিত করিবেন।
কাফেলার একজন অবাক হয়ে বললেনঃ জনাব! আপনি আজ আপনার দীর্ঘকালের অভ্যাসের ব্যতিক্রম করে অভিনব কাজ করলেন। কতবার এ পথে যাতায়াত করেছি, আপনাকে তো কখনও গির্জার বাইরে বের হতে দেখিনি বা এরুপ কারও জন্য ভোজের ব্যবস্থা করতেও দেখিনি।
বাহিরা প্রকৃত ব্যাপার এড়িয়ে গেলেন। বললেনঃ আজ যেহেতু আপনারা আমার খুব কাছাকাছি যাত্রাবিরতি করলেন, তাই আপনারা আমার মেহমান। খাদ্য তৈরি হচ্ছে, আপনারা তা গ্রহণ করবেন, এ আমার অনুরোধ। কাফেলার লোকেরা খেতে গেল। মালামাল প্রহরার প্রয়োজনে এবং অল্পবয়সী বিধায় রাসূল (সা) গাছের নিচেই রয়ে গেলেন।
বাহিরা গির্জা থেকে বের হয়ে এলেন। তীক্ষ্ণ চোখে কাছ থেকে সকলকে জরিপ করে তিনি হতাশ হলেন। বললেনঃ হে কুরায়শী মেহমানগণ! আপনারদের মাঝে কেউ কি এখানে আসতে বাকি রয়ে গেছে ? লোকেরা বললঃ আসার মত যারা সকলেই এসে গেছে। কেবল একজন বালক রয়ে গেছে। বাহিরা চমকে উঠলেন। বললেনঃ কক্ষণও না। কাউকেই দয়া করে বাকি রাখবেন না। কুরায়শের এক সরদারও তীক্ষ্ণ কন্ঠে বলে উঠলো, লাত ও উজ্জার কসম! আবদুল মুত্তালিবের পৌত্র কাফেলার আছে অথচ আমাদের সাথে ভোজে শরীক হবে না এ কখনও হতে পারে না। এটা আমাদের সকলের জন্য বড় নিন্দনীয় ব্যাপার। এ সরদার নিজেই উঠে গিয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে কোলে করে নিয়ে এলো এবং খাদ্যের সামনে বসিয়ে দিল।
এবার কাছ থেকে বাহিরা তাঁকে গভীরভাবে নিরীক্ষণের সুযোগ পেলেন। পূর্ববর্তী আসমানী গ্রন্থগুলো সম্পর্কে তার অসাধারণ ইলেম ছিল। সেগুলোর মাঝে শেষ রাসূল সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী ও বিশেষ বিশেষ লক্ষণসমূহের বিস্তারিত বর্ণনা বিদ্যমান ছিল। বাহিরার অন্তরে সব কিছু স্পট হয়ে গেল। খুশিতে আত্মহারা হলেন তিনি।
সকলে খেয়েদেয়ে চলে যাওয়ার সময় রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে এসে তিনি বসলেন। গম্ভীর স্বরে বললেনঃ “বালক! আমি তোমাকে লাত ও উজ্জার কসম দিয়ে বলছি- আমার কিছু প্রশ্নের তুমি জবাব দেবে।” বাহিরা জনৈক কুরায়শীকে ইতিপূর্বে লাত ও উজ্জার কসম দিতে শুনেছিলেন, তাই এরুপ বললেন। কিশোর রাসূলুল্লাহ্ (সা) বাধা দিয়ে বললেনঃ আমাকে এ লাত ও উজ্জার কসম দিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করবেন না। আল্লাহর কসম, এ দেবতাদের আমি সবচেয়ে ঘৃণা করি। বাহিরা বললেনঃ বেশ তো আল্লাহর কসম বলছি। রাসূল (সা) বললেন ঃ ঠিক আছে, কি জানতে চান বলুন। বাহিরা তাঁকে অনেক কথা জিজ্ঞেস করলেন। খাওয়া-দাওয়া ও ঘুমের বিভিন্ন অভ্যাসের কথা জিজ্ঞেস করে জানলেন। দেহের গঠন-প্রকৃতি বিশেষভাবে লক্ষ্য করলেন। বিশেষত তাঁর পৃষ্টাদেশ দেখলেন। তাতে মোহরে নবুওয়াত বর্ণিত মতে দেখতে পেলেন। বিস্ময়ে আনন্দে বিহবল হয়ে বাহিরা দেখলেন, সবই পূর্ববর্তী আসমানী গ্রন্থসমূহের বর্ণনার সাথে সম্পূর্ণ মিলে গেছে।
তারপর বাহিরা আবূ তালিবকে কাছে ডেকে জিজ্ঞেস করলেনঃ ছেলেটি কে ? আবূ তালিব বললেনঃ আমার। বাহিরা বললেনঃ কিন্তু এ ছেলের তো পিতা জীবিত থাকার কথা নয়। আবূ তালিব বললেনঃ “আসলে সে আমার ভাতিজা।” বাহিরা জিজ্ঞেস করলেনঃ তাঁর পিতার কি হয়েছে ? বললেনঃ তার মায়ের পেটে থাকা অবস্থায়ই পিতা ইন্তিকাল করেন।
চমৎকৃত হয়ে বাহিরা বললেন, এরকমই তো হওয়ার কথা। আপনি আপনার ভাতিজাকে নিয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দেশে ফিরে যান। ইহুদীদের থেকে তাকে সাবধানে আগলে রাখবেন। আল্লাহর কসম ! ওরা যদি একে দেখতে পায় এবং নিদর্শনাবলি থেকে আমি যেমন চিনতে পেরেছি ওরাও তেমনি চিনে ফেলতে পারে তবে ওরা এ বালকের ক্ষতি করার সমূহ চেষ্টা করবে। কারণ আপনার ভাতিজাই ভবিষ্যত মানবজাতির পথপ্রদর্শক-নবী। একথা শুনে আবূ তালিব সেখানেই দ্রুত তাঁর মালামাল বিক্রয় করে দিলেন। আশাতীত মুনাফা হলো এবং রাসূলুল্লাহ (সা)-কে নিয়ে দ্রুত দেশে ফিরে এলেন।
তথ্যসূত্র
• মাদারেজুন্নাওয়াত
• রাসুলুল্লাহ (সঃ) এর জীবনে আল্লাহর কুদরত ও রুহানিয়াত (লেখকঃ মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুল গফুর হামিদী, প্রকাশকঃ ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ)

আসরের ওয়াক্ত শুরু

আসরের ওয়াক্ত শুরু। সবাইকে নামাজ পড়তে হবে। অজুর জন্য পানির প্রয়োজন। কিন্তু পানি পাওয়া যাচ্ছে না।নবীজীর(সাঃ) সামনে একটি পাত্রে সামান্য একটু পানি যা দিয়ে একজনের অজুও হয় না। সাহাবীদের সংখ্যা অনেক। নবীজী(সাঃ) তাঁর সামনে রাখা পাত্রের পানিতে তদীয় পবিত্র হস্ত মুবারক রাখলেন।আর ততক্ষনাৎ তাঁর আংগুলের ফাক দিয়ে পানি উথলে উঠা শুরু করল। নবীজী(সাঃ) সবাইকে দ্রুত অজু সেরে নিতে বললেন। সবাই অজু করলেন। শেষে নবীজীও করলেন। হাদীসের বর্ণনায়----
একঃ
আবদুল্লাহ ইব্‌ন ইউসুফ (রঃ).....আনাস ইব্‌ন মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সাঃ) কে দেখলাম, তখন আসরের সালাতের সময় হয়ে গিয়েছিল। আর লোকজন উযূর পানি তালাশ করতে লাগল কিন্তু পেল না। তারপর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) পাত্রে তাঁর হাত রাখলেন এবং লোকজনকে তা থেকে উযূ করতে বললেন। আনাস (রাঃ) বলেন, সে সময় আমি দেখলাম, তাঁর আঙ্গুলের নীচ থেকে পানি উথলে উঠছে। এমনকি তাদের শেষ ব্যক্তি পর‌্যন্ত তা দিয়ে উযূ করল। (বুখারী শরীফ ১ম খন্ড, ১৭০ নং হাদিস, ইফা)
দুইঃ
‘আবদুল্লাহ ইব্‌ন মুনীর (রঃ)..... আনাস ইব্‌ন মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ একবার সালাতের সময় উপস্থিত হলে যাঁদের বাঢ়ী নিকটে ছিল তাঁরা (উযূ করার জন্য) বাড়ী চলে গেলেন। আর কিছু লোক রয়ে গেলেন (তাঁদের কোন উযূর ব্যাবস্থা ছিল না)। তখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর জন্য পাথরের পাত্রে পানি আনা হল। পাত্রটি এত ছোট ছিল যে, তার মধ্যে তাঁর উভয় হাত মেলে দেওয়া সম্ভব ছিল না। তা থেকেই কওমের সকল লোক উযূ করলেন। আমরা জিজ্ঞাসা করলামঃ ‘আপনারা কতজন ছিলেন’? তিনি বললেনঃ ‘আশিজন বা আরো বেশী। (বুখারী শরীফ ১ম খন্ড, ১৯৫ নং হাদিস, ইফা)

Thursday, 21 July 2016

মানত ভঙ্গ করার পরিণতি


ফরিদপুর জেলার এক কৃষক, যিনি বিশ্বওলী খাজাবাবা ফরিদপুরীর (কুঃ ছেঃ আঃ) একজন মুরীদ, দরবার শরীফে গিয়ে হযরত কেবলাজন হুজুরের কাছে অতি উদ্বেগের সাথে নালিশ জানালেন যে, তিনি তার জমিতে বেগুনের চাষ করেন। কিন্তু ঝাঁকে ঝাঁকে বুলবুলি পাখি এসে সব বেগুন খেয়ে ফেলে, নষ্ট করে ফেলে। লোকটির নালিশ শুনে পীর কেবলাজান খুব অবাক হয়ে মধুর কন্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন, “কেন বাবা? বুলবুলি পাখি আপনার বেগুন ক্ষেত নষ্ট করে ফেলে কেন?”
আগত জাকের ভাই এবার বিস্তারিত সব ঘটনা খুলে বললেন, “ হুজুর, আমি জমিতে বেগুনের চাষ করে নিয়্যত করেছিলাম যে, প্রথম ফলনের সব বেগুন হুজুর পাকের দরবারে নজরানা হিসেবে দিয়ে দেব। কিন্তু প্রথম ফলন খুব ভাল হওয়াতে এবং বেগুনের দামও হঠাত খুব বেড়ে যাওয়াতে নিয়্যত পাল্টে ফেলে মনে মনে ঠিক করলাম যে, এবার না হয় দরবার শরীফে বেগুন নাইবা দিলাম। ভালো মূল্যে এবারের বেগুন গুলো বিক্রি করে পুজি বাড়িয়ে পরবর্তী বছরে বেগুন দরবার শরীফে দিয়ে দেব”। এ পর্যন্ত বলে চাষী একটু ঢোক গিললেন। পরের কথা গুলো বলার আগে হুজুর পাকই জিজ্ঞাসা করলেন, “তারপর কি হলো বলেন।” বেগুন চাষী জাকের ভাই জানলেন যে, দ্বিতীয় দফায় বেগুন গাছে ফুল ধরতে শুরু করলো, তখন কোথা থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে বুলবুলি পাখি এসে তার ক্ষেতের বেগুন ফুল খাওয়া শুরু করল। ফলে সেবার ফলনও খুব কম হলো। তাই সেবারও নিয়্যত পাল্টে সিদ্ধান্ত নিলেন যে, এত কম ফলনের বেগুন দরবারে না দিয়ে পরর্বতী ফলনে (তৃতীয় দফায়) যে বেগুন হবে সেগুলো হুজুর পাকের দরবারে নজরানা হিসেবে দিয়ে দেবেন, আর এতে কোন অন্যথা করবেন না। কিন্তু পরবর্তী দফায় হতভাগ্য বেগুন চাষীর কপালের দূর্ভোগ আরো বেড়ে গেল। এবার আগের চেয়েও অনেক বেশী সংখ্যক বুলবুলি পাখি ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে এসে বেগুনের শুধু ফুলই নয়, ফুল শুদ্ধ গাছের ডগা পর্যন্ত খেয়ে ফেলল।
ঠোকর দিয়ে সব গাছ একেবারে ছিন্নভিন্ন করে ফেলল। ফলে বেগুন চাষী এখন সর্বস্বান্ত হবার পথে। তাই তিনি বাধ্য হয়ে খাজাবাবা ফরিদপুরী (কুঃ ছেঃ আঃ) স্মরণাপন্ন হয়েছেন। উদ্দেশ্য, খাজাবাবা যেন দয়া করে এ মহা মছিবত থেকে উদ্ধারে তার জন্য আল্লাহর দরবারে দু‘আ করেন।
সব শুনে হযরত কেবলাজান হুজুর আপন স্বভাবজাত মধুর সুরে বিস্ময়ের কন্ঠে বললেন, “বাবা, বুলবুলি পাখি যে আপনাকে শুদ্ধ খেয়ে ফেলেনি, এটাই আপনার পরম সৌভাগ্য। ওলী আল্লাহদের সাথে মুনাফেকী করা ঠিক নয়”।
(তথ্যসূত্রঃ বিশ্বওলী খাজাবাবা ফরিদপুরী(কুঃ) ছাহেবের কতিপয় অবিস্মরনীয় কারামত)

Monday, 18 July 2016

মায়ের মমতা এবং হযরত সোলায়মান(আঃ)-এর বিচক্ষণতা



নবী হযরত দাউদ (আঃ) এর যামানার ঘটনা। দুইজন মহিলা তাহাদের নিজ নিজ কোলে একটি করিয়া শিশু বহন করিয়া কোথাও যাইতেছিল। পথিমধ্যে এক মহিলা বাঘের আক্রমণের মুখে পতিত হইয়া স্বীয় শিশুটি হারাইল।নিজের শিশু হারাইয়া কি করিবে কিছু স্থির করিতে না পারিয়া তাহার সঙ্গী মহিলাটির কোল হইতে উহার শিশুটিকে ছিনিয়া নিয়া বলিল, এই শিশুটি আমার। তোমার শিশু বাঘে নিয়া গিয়াছে। উভয়ের মধ্যে খুব বাচসা ও কথা কাটাকাটি হইল। পরিশেষে উহারা উভয়ে নবী হযরত দাউদ (আঃ) এর দরবারে উপস্থিত হইয়া একে অপরের বিরুদ্ধে নালিশ জানাইল।
নবী হযরত দাউদ (আঃ) বিচার শেষে সেই কুচক্রী মহিলাটিকে শিশুটি দিয়া দিলেন। এই খবর শুনিয়া তাহার ছেলে হযরত সোলায়মান (আঃ) স্বীয় পিতার নিকট বলিলেন, “আব্বাজান! এই ব্যাপারে আমার নিকট একটি চমতকার সমাধান আছে, আপনি অনুমতি দিলে শুনাইতে পারি।” নবী হযরত দাঊদ (আঃ) অনুমতি দিলে হযরত সোলায়মান (আঃ) বলিলেন, আমি শিশুটিকে এখনই দুই টুকরা করিয়া অর্ধেক করে উভয়ের মধ্যে বন্টন করিয়া দিব।” এই ফয়সালা শুনিয়া কুচক্রী মহিলাটি নিশ্চুপ রহিল। আর শিশুর আসল মাতা বলিয়া উঠিল, “ হুযুর! শিশুটি উহাকে দিয়া দিন। আল্লাহর কসম দিতেছি শিশুটিকে দুই টুকরা করিবেন না।” তখন হযরত সোলায়মান (আঃ) বলিলেন, শিশুর আসল মাতা হইল এই রমণীই। যাহার অন্তরে মাতৃ মমতা নিহিত রহিয়াছে, সেই উহাকে দ্বিখন্ডিত করনের ফয়সালায় বাধা হইয়া নিজ দাবী পরিত্যাগ করিয়াছে। অতঃপর শিশুটিকে তাহার আসল মাতার নিকট অর্পণ করিলেন।
তথ্যসূত্রঃ
* মিশকাত শরীফ- ৫০০ পৃঃ
* ফতহুল বারী দ্বাদশ খন্ড- ২৬৮ পৃঃ
* ইসলামের জীবন্ত কাহিনী- ১০০ পৃঃ