Showing posts with label amaderislam;. Show all posts
Showing posts with label amaderislam;. Show all posts

Monday, 5 December 2016

গীবত ও পরনিন্দা ?/?


‘গীবত’ এর শাব্দিক অর্থ পরনিন্দা, অসাক্ষাতে অন্যের দোষত্রুটি বর্ণনা করা। ইসলামী পরিভাষায় গীবত বলা হয় কাহারও অসাক্ষাতে তাহার দোষত্রুটি (যাহা সাক্ষাতে বলিলে সে ব্যথিত হইত) বর্ণনা করা (কথা, লেখনী, বা ইশারা-ইঙ্গিতের মাধ্যমে) যদিও সেই সকল দোষত্রুটি তাহার মধ্যে থাকে। আর যদি সে দোষ তাহার মধ্যে না থাকে তাহা হইলে উহাকে অপবাদ বলা হয়। উলামায়ে কিরাম বিভিন্নভাবে গীবতের যে সংজ্ঞা বর্ণনা করিয়াছেন তাহার মর্ম ইহাই। হাদীসেও এই কথাই বলা হইয়াছেঃ
আবু হুরায়রা (রাঃ) হইতে বর্ণিত। একদা রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ) বলিলেনঃ গীবত কি তোমরা কি তাহা জান? তাঁহারা(সাহাবীগণ) বলিলেনঃ আল্লাহ্‌ ও তাঁহার রাসূলই ভাল জানেন। তিনি বলিলেনঃ তোমার ভাই সম্পর্কে এমন আলোচনা করা যাহা সে অপসন্দ করে। বলা হইলঃ আপনি এই ব্যাপারে কি মনে করেন যে, আমি যাহা বলিতেছি তাহা যদি আমার ভাইয়ের মধ্যে থাকে? তিনি বলিলেনঃ তুমি যাহা বলিতেছ তাহা যদি তোমার ভাইয়ের মধ্যে থাকে তাহা হইলেই তুমি তাহার গীবত করিলে। আর যদি উহা তাহার মধ্যে না থাকে তবে তুমি তাহাকে অপবাদ দিলে।
তথ্যসূত্রঃ
১। মুসলিম শরীফ, হাদীস নং ৬৩৫৭ ইফা,
২। আবূ দাউদ শরীফ, হাদীস নং ৪৭৯৮ ইফা
গীবতের সংজ্ঞায় ইমাম গাজ্জালী(রঃ) বলেন, গীবত বলা হয় অপরের এমন আলোচনা করা-যা সে শুনলে খারাপ মনে করে। এ আলোচনা অন্যের দৈহিক ত্রুটি, বংশগত ত্রুটি, চারিত্রিক ত্রুটি বা দোষ আলোচনা করা, ধর্ম, কর্ম, পোশাক-পরিচ্ছদ, ঘর-বাড়ী, গাড়ী-ঘোড়ার দোষ সম্পর্কিত হলেও গীবত।( তথ্যসূত্রঃ ইহইয়া উলুমুদ্দিন)
কুরআন পাক ও হাদীস শরীফে গীবতকে খুবই ঘৃণিত কাজ বলিয়া উল্লেখ করিয়া উহা হইতে বিরত থাকিবার জন্য কঠোরভাবে নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে। কুরআন কারীমে বলা হইয়াছে- “এবং একে অপরের পশ্চাতে নিন্দা করিও না। তোমাদিগের মধ্যে কি কেহ তাহার মৃত ভ্রাতার গোশত ভক্ষণ করিতে চাহিবে? বস্তুত তোমরা তো ইহাকে ঘৃণ্যই মনে কর”। (সূরা ৪৯ হুজুরাতঃ১২)
হাদীছ শরীফে উল্লিখিত হইয়াছেঃ আনাস ইব্‌ন মালিক (রাঃ) হইতে বর্ণিত। রাসূলূল্লাহ (সাঃ) বলেনঃ মিরাজ রজনীতে আমাকে যখন আকাশে লইয়া যাওয়া হয় তখন (সেখানে) আমি একদল লোকের নিকট দিয়া গমন করিলাম। তাহাদের নখগুলি ছিল আগুনের। উহা দিয়া তাহারা তাহাদের মুখমন্ডল এবং পেট ক্ষত বিক্ষত করিতেছিল। আমি বলিলামঃ ইহারা কাহারা হে জিবরাঈল? জিব্‌রাঈল বলিলেনঃ ইহারা সেই সকল লোক যাহারা মানুষের গোশত ভক্ষণ (গীবত) করিত এবং তাহাদের সম্মান বিনষ্ট করিত।(আবূ দাউদ শরীফ, হাদীস নং ৪৮০১ ইফা)
হযরত আনাস (রাঃ) বলেন, একদিন নবী করীম (সাঃ) রোযার আদেশ দিয়ে বললেন, আমি যে পর্যন্ত অনুমতি না দেই কেউ ইফতার করবে না। সাহাবায়ে কিরাম রোজা রাখলেন। সন্ধ্যা হলে এক একজন এসে ইফতারের অনুমতি নিতে লাগল। এক ব্যক্তি আরজ করল, হে আল্লাহর নবী! দুজন মহিলাও রোযা রেখেছিল, আপনি অনুমতি দিলে তারাও ইফতার করত। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মুখ ফিরিয়ে নিলেন। এভাবে সে পুনরায় একই কথা বললো এবং রাসূলও (সাঃ) মুখ ফিরিয়ে নিলেন। এভাবে সে তৃতীয় বার নিবেদন করার পর তিনি বললেন, তারা রোযা রাখেনি। যারা সারাদিন মানুষের গোশত ভক্ষণ করে, তাদের আবার কিসের রোযা? তুমি গিয়ে তাদেরকে বল, তোমরা রোযা রেখে থাকলে বমি কর, সে মহিলাদ্বয়কে এ নির্দেশ শুনিয়ে দিল। তারা বমি করলে প্রত্যেকের মুখ দিয়ে জমাট রক্ত নির্গত হল। লোকটি এসে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর নিকট ঘটনা বর্ণনা করলে তিনি বললেন, আল্লাহর কসম যার কব্জায় আমার প্রাণ, যদি এ জমাট মাংসপিন্ড তাদের পেটে থেকে যেত তবে তাদেরকে জাহান্নাম খেয়ে নিত। (তথ্যসূত্রঃ এহইয়া উলুমুদ্দীন)
আবূ বারযাঃ আল-আসলামী (রাঃ) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেনঃ হে ঐ সকল লোক, যাহারা মুখে ঈমান আনিয়াছ অথচ অন্তরে ঈমান প্রবেশ করে নাই। তোমরা মুসলমানদের গীবত করিও না এবং তাহাদের দোষ অণ্বেষণ করিও না। কারণ যে তাহাদের দোষ অন্বেষণ করিবে আল্লাহ তাহাদের দোষ অন্বেষন করিবেন। আর আল্লাহ যাহার দোষ অন্বেষণ করিবেন তাহাকে অপদস্থ করিয়া ছাড়িবেন।(আবূ দাউদ শরীফ, হাদীস নং ৪৮০২ ইফা)।
হযরত আয়েশা (রাঃ) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমি একবার রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে বলিলামঃ সাফিয়্যার এই রকম এই রকম অর্থাত খাটো হওয়া আপনার জন্য যথেষ্ট। তখন তিনি বলিলেনঃ তুমি এমন একটি কথা বলিয়াছ যদি তাহা সমুদ্রে ফেলা (সহিত মিশানো) হইত তবে অবশ্যই সমুদ্র পরিপূর্ণ হইয়া যাইত। আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ আমি তাঁহাকে একজন লোকের কথা শুনাইলাম। তিনি বলিলেনঃ আমি ইহা পছন্দ করিনা যে, আমি কোনও লোকের কথা বর্ণনা করিব আর আমার জন্য এইরূপ এইরুপ হইবে। (আবূ দাউদ শরীফ, হাদীস নং ৪৭৯৯ ইফা)।
আবূ হুরায়রা (রাঃ) হইতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেনঃ এক মুসলিমের উপর অন্য মুসলিমের সম্পদ, সম্মান এবং জান হারাম করা হইয়াছে। কোনও লোকের দুস্কর্ম করার জন্য ইহাই যথেষ্ট যে, সে তাহার মুসলিম ভাইকে হেয় প্রতিপন্ন করিবে (আবূ দাউদ শরীফ, হাদীস নং ৪৮০৪ ইফা)।
হযরত জাবির ও আবু সায়ীদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করেন, “ গীবত করা থেকে তোমরা বেচেঁ থাক। কেননা, গীবত যেনার চেয়েও নিকৃষ্টতম।” অর্থাতঃ- যেনা করে মানুষ তওবা করলে আল্লাহ পাক তওবা কবুল করে নেন কিন্তু গীবতকারীকে মাফ করা হয় না যতক্ষণ যার গীবত করা হয় সে মাফ না করে।”
তথ্যসূত্রঃ
ক) মেরকাত শরহে মেশকাত, গীবত অধ্যায়
খ) জামেউস সাগীর, গীবত অধ্যায়
গ) কানযুল উম্মাল
বিশ্বওলী, খাজাবাবা হযরত ফরিদপুরী(কুঃ ছেঃ আঃ) ছাহেব মোহাছাবার অধ্যায়ে অধিক কথা বলার ক্ষতির আলোচনা করতে গিয়ে গীবত সম্পর্কে বলেন,
অধিক কথা বলায় বহুবিদ অপরাধ সংঘটিত হওয়ার সম্ভাবনা বিদ্যমান। অধিক কথা বলার কুফল নিম্নরুপঃ-
(ক) যাহারা অধিক কথা বলে, ইচ্ছায় হউক, অনিচ্ছায় হউক, তাহার পরনিন্দা, পরচর্চা বা গীবত করিয়া থাকে।
(খ) মিথ্যা কথা বলে।
(গ) ওয়াদা ভংগ করে, কারণ ওয়াদা দেওয়ার সময় চিন্তাভাবনা না করিয়াই ওয়াদা দেয়। পরে আর রক্ষা করিতে পারে না।
(ঘ) অতিরিক্ত কথা বলার কারণে আসল কথাকে অতিরঞ্জিত করে।
(ঙ) বেহুদা কথায় লিপ্ত থাকে।
(চ) হাস্য-কৌতুকে সময় কাটায়। ফলে যিনি অধিক কথা বলেন, তাহার দেল মারা যায়। হযরত শেখ সাদী (রঃ) বলেন, “তোমার কথা আদন এর মুক্তার চেয়েও যদি মূল্যবান হয়, তথাপিও তুমি যদি বেশী কথা বল, তবে তোমার দেল মারা যাইবে। দেল অন্ধকার অচ্ছন্ন হইবে।”
অধিক কথা বলায় যে পাপ মানুষ সবচেয়ে বেশী করে তাহা হইল গীবত অর্থাত পরনিন্দা বা পরর্চচা এবং মিথ্যা কথা বলা। এইদুটোই ইসলামী দৃষ্টিকোনে জঘন্য অপরাধ বলিয়া পরিগণিত। গীবত কি? কোন ব্যক্তির অসাক্ষাতে তাহার দোষ-ত্রুটির আলোচনা করাকে গীবত বলে। রাসূলে পাক (সাঃ) বলেন, “গীবত যেনা হইতেও কঠিনতম গোনাহ।” ছাহাবাগণ আরজ করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ (সাঃ)! গীবত যেনা হইতেও কঠিনতর? তিনি বলিলেন “কোন ব্যক্তি যেনা করিয়া তওবা করিলে আল্লাহতায়ালা তাহার তওবা কবুল করেন এবং তাহাকে মাফ করিয়া দেন, কিন্তু গীবতকারীর জন্য তওবার কোন বিধান নাই, যে পর্যন্ত না যাহার গীবত করা হইয়াছে, সে মাফ করে।”
(তথ্যসূত্রঃ নসিহত-সকল খন্ড একত্রে, পৃষ্টা নং ৮২, নসিহত নং-৬)
কাজেই বুঝা গেল গীবত এক জঘন্য পাপ। আত্মার এক ঘৃণ্য ব্যাধি। আল্লাহপাক আমাদের দয়া করুন যেন এই জঘন্য পাপ থেকে আমরা নিজেদের হেফাযত করতে পারি। আমিন।
----আকতার হোসেন কাবুল

Friday, 18 November 2016

কুরআন ও হাদইসের আলোকে আল্লাহ্‌র ওলীর পরিচয়???


ওলী’ শব্দটি আরবী বিলায়াত / ওয়ালায়াত শব্দ থেকে গৃহীত। শব্দটির অর্থ নৈকট্য, বন্ধুত্ব বা অভিভাবকত্ব। বিলায়াত অর্জনকারীকে ‘ওলী’ /‘ওয়ালী’ বলা হয়। অর্থাৎ নিকটবর্তী, বন্ধু, সাহায্যকারী বা অভিভাবক। ইসলামী পরিভাষায় ‘বিলায়াত’ ‘ওলী’ ও ‘মাওলা’ শব্দের বিভিন্ন প্রকারের ব্যবহার রয়েছে। উত্তরাধিকার আইনের পরিভাষায় ও রাজনৈতিক পরিভাষায় এ সকল শব্দ বিশেষ অর্থে ব্যবহৃত। তবে বেলায়েত বা ওলী শব্দের সর্বাধিক ব্যবহৃত হয় ‘আল্লাহর বন্ধুত্ব’ ও ‘আল্লাহর বন্ধু’ অর্থে।
পাক কুরআনের আলোকে আল্লাহর ওলীঃ
পাক কুরআনে মহান আল্লাহ বলেনঃ
“জেনে রাখ! নিশ্চয় আল্লাহ্‌র ওলীগণের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুশ্চিন্তাগ্রস্তও হবে না- যারা ঈমান এনেছে এবং যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি থেকে আত্মরক্ষা করে চলে বা তাকওয়া অবলম্বন করে।”(সূরা ইউনূসঃ ৬২-৬৩)
উল্লিখিত আয়াতপাকে দুটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। যথাঃ
১। যারা ঈমান এনেছে।
২। যারা তাকওয়া বা খোদাভীতি অর্জন করে যাবতীয় পাপ থেকে নিজেকে বিরত রেখেছে।
এদু’টি গুণ যারা অর্জন করল তাদের কোন ভয় নেই, তারা দুঃখিতও হবে না। তারাই আল্লাহর ওলী বা বন্ধু।
হাদীসের আলোকে আল্লাহর ওলীঃ
রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ) বলেছেন যে, ফরয ইবাদতগুলো পালনের সাথে সাথে অনবরত নফল পালনের মাধ্যমে বান্দা বেলায়েত বা আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করেন। তিনি বলেন, আল্লাহ বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আমার কোনো ওলীর সাথে শত্রুতা করে আমি তার সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করি। আমার নৈকট্য অর্জন বা ওলী হওয়ার জন্য বান্দা যত কাজ করে তন্মধ্যে আমি সবচেয়ে বেশি ভালবাসি যে কাজ আমি ফরয করেছি।(ফরয পালনই আমার নৈকট্য অর্জনের জন্য সবচেয়ে প্রিয় কাজ)। এবং বান্দা যখন সর্বদা নফল ইবাদত পালনের মাধ্যমে আমার বেলায়েতের পথে বা আমার সান্নিধ্যের পথে অগ্রসর হতে থাকে তখন আমি তাকে ভালবাসি। আর যখন আমি তাকে ভালবাসি তখন আমি তার শ্রবণযন্ত্রে পরিণত হই, যা দিয়ে সে শুনতে পায়, আমি তার দর্শনেন্দ্রিয় হয়ে যাই, যা দিয়ে সে দেখতে পায়, আমি তার হাত হয়ে যাই যদ্দ্বারা সে ধরে এবং আমি তার পা হয়ে যাই, যদ্দ্বারা সে হাঁটে। সে যদি আমার কাছে কিছু প্রার্থনা করে তাহলে আমি অবশই তাকে তা প্রদান করি। সে যদি আমার কাছে আশ্রয় চায় তাহলে আমি অবশ্যই তাকে আশ্রয় প্রদান করি।”(সহীহ বোখারী শরীফ, হাদীস নং ৬০৫৮ ইফা)
বর্ণিত হাদীসে বেশ কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। যথাঃ
যারা আল্লাহর ওলী
১। তারা ফরয ইবাদত নিখুত ভাবে পালন করেন।
২। বেশী বেশী নফল বন্দেগী করেন।
৩। বন্দেগী করতে করতে তারা আল্লাহর ভালবাসা লাভ করেন।
৪। তখন তারা এমন এক অবস্থা লাভ করেন যে তাদের হাত, পা, চোখ, কান তথা সর্বাংগ আল্লাহ নিজের বলে ঘোষণা দেন। একেই তরিকতের পরিভাষায় ফানাফিল্লাহ বলে। অর্থাত আল্লাহর অস্তিত্বে বিলীন হওয়া বলে।
যেমনঃ পাক কালামে আল্লাহতায়ালা নবীজীকে(সাঃ) উদ্দেশ্য করে বলেন,
ক) ‘যারা আপনার হাতে হাত রেখে বায়াত হয়, তারাতো আল্লাহরই হাতেই বায়াত হয়। তাদের হাতের উপর রয়েছে আল্লাহর হাত।’(সূরা ৪৮ ফাতহঃ ১০)
খ) ‘আপনি যে ধুলির মুষ্টি নিক্ষেপ করেছিলেন তা আপনি করেননি, বরং তা করেছিলেন আল্লাহ স্ময়ং।’ (সূরা ৮ আনফালঃ ১৭)
কাজেই বুঝা গেল, আল্লাহর রাসূল(সাঃ) আল্লাহর অস্তিত্বে লীন ছিলেন বিধায় আল্লাহপাক তার হাতকে নিজের হাত বলে উল্লেখ করেছেন।
৫। তখন তারা আল্লাহর নিকট এমন এক ‌মযাদা বা সম্মান লাভ করেন যে, তাদের সাথে কেউ কোনরকম শত্রুতা করলে আল্লাহ তা বরদাস্ত বা সহ্য করেন না।
৬। তাদের প্রার্থনাসমূহ আল্লাহ অবশ্যই কবুল করেন।
৭। আল্লাহতায়ালা নিজে তাদের অশ্রয়স্থল হন।
উল্লিখিত গুণসমূহ দয়াল নবীজী(সাঃ) এর মধ্যে সবচেয়ে বেশী পরিলক্ষিত হয়। তাই নবীজী(সাঃ)-ই আল্লাহর সবচেয়ে বড় বন্ধু বা ওলী। তারপর যারা নবী-করিম(সাঃ) এর পরিপূর্ণ অনুসরনের মাধ্যমে উল্লিখিত গুণসমূহ অর্জন করতে পারেন তারাও আল্লাহর সান্নিধ্য লাভে ধন্য হন। আল্লাহর ওলী বা বন্ধু হিসাবে পরিগণিত হন।
বর্তমান জামানায় আল্লাহর সর্বাধিক নৈকট্যপ্রাপ্ত সূফীসাধক হলেন বিশ্বওলী খাজাবাবা হযরত ফরিদপুরী(কুঃ ছেঃ আঃ) ছাহেব। দুনিয়াব্যপী যার কোটি কোটি মুরীদান তারই বাতেনী প্রতিপালনে আল্লাহতায়ালার নৈকট্য বা সান্নিধ্যের পথে অগ্রসর হচ্ছে।
আল্লাহর ওলীর পরিচয় দিতে গিয়ে তিনি বলেন, আল্লাহর ওলীগণ হলেন জ্বলন্ত লৌহসদৃশ। এক খন্ড লৌহ যেইরুপ আগুনে পুড়িয়া আগুনের রং ধারন করে, সেইরুপ আল্লাহর ওলীগণ আল্লাহতায়ালার নূরের তাজাল্লীতে জ্বলিয়া আল্লাহর গুণে গুনান্বিত হন।
------কাবুল

Saturday, 15 October 2016

পীর-মুরীদ কাকে বলে?


‘পীর’ শব্দটি ফরাসী শব্দ, যার বাংলা অর্থ হল ‘বৃদ্ধ বা মুরব্বী’। পরিভাষায় বলা হয়, যিনি শরিয়ত, তরিকত, হাকিকত ও মারেফত তথা জাহেরী ও বাতেনী জ্ঞানে জ্ঞানী-তাকেই কামেল পীর বা ওলী বলে। পবিত্র কোরআনে এরকম লোককে ‘মুর্শেদ ও হাদী’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
মুরশীদ শব্দের অর্থ হল পথপ্রদর্শক। যিনি আল্লাহর আদেশ নিষেধ আল্লাহ তাআলা যেভাবে চান সেভাবে পালন করার প্রশিক্ষণ দেন তার নাম মুরশীদ বা পথপ্রদর্শক। যাকে ফার্সীতে বলে পীর।
“মুরীদ” শব্দটিও আরবী। যার অর্থ হল ইচ্ছাপোষণকারী। যে ব্যক্তি আল্লাহর আদেশ নিষেধ আল্লাহ তাআলা যেভাবে চান সেভাবে পালন করার ইচ্ছা পোষণ করে কোন বুযুর্গ ব্যক্তির হাত ধরে শপথ করে, সে ব্যক্তির নাম হল “মুরীদ”। এ ব্যাখ্যা থেকে একথা স্পষ্ট হল যে, পীর হবেন শরীয়তের আদেশ নিষেধ পালন করার প্রশিক্ষণদাতা। আর যিনি সে প্রশিক্ষণ নিতে চায় সে শিক্ষার্থীর নাম হল “মুরীদ”।
সুতরাং যে ব্যক্তি নিজেই শরীয়তের বিধান মানে না, নামায পড়ে না, পর্দা করে না, সতর ঢেকে রাখে না বা শরীয়তের আবশ্যকীয় কোন বিধান পালন করে না, সে ব্যক্তি কিছুতেই পীর তথা মুর্শীদ হতে পারে না। কারণ তার নিজের মাঝেই যখন শরীয়ত নেই, সে কিভাবে অন্যকে শরীয়তের উপর আমল করা প্রশিক্ষণ দিবে? নিজেইতো প্রশিক্ষিত নয়।
আর পীর মুরীদির এ পদ্ধতি রাসূল (সাঃ) থেকে চলে আসছে। রাসূল (সাঃ) সাহাবাদের আল্লাহমুখী হওয়ার প্রশিক্ষণ দিতেন। সাহাবারা রাসূল (সাঃ) এর কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিতেন। বলা যায় রাসূল (সাঃ) হলেন সবচে’ প্রথম ও বড় পীর, ও সাহাবায়ে কিরাম হলেন প্রথম মুরীদ।

Saturday, 10 September 2016

হযরত আবু বকর (রাঃ) অসুস্থ ???


মুহাম্মদ ইবনুল মুনকাদির বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) অসুস্থ আবু বকর (রাঃ)-কে দেখতে গেলেন। তখন তিনি সেখান থেকে বের হয়ে হযরত আয়েশা (রাঃ)-র কাছে তাশরীফ নিলেন। উদ্দেশ্য, তাঁকে তাঁর পিতার অসুস্থতার সংবাদ দেওয়া। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ঘরে প্রবেশ করা মাত্র হযরত আবু বকর (রাঃ) দরজার বাইরে থেকে ভিতরে প্রবেশ করার অনুমতি চাইলেন। হযরত আয়েশা (রাঃ) বললেন, আব্বাজান দেখি তাশরীফ নিয়ে এসেছেন। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) খবই আশ্চর্য প্রকাশ করতে লাগলেন যে, আল্লাহ্ পাক এত দ্রুত তাকে আরোগ্য দান করেছেন। হযরত আবু বকর (রাঃ) আরয করলেন, হুজুর! আপনি বের হওয়া মাত্রই হযরত জিব্রাইল (আঃ) আগমন করলেন এবং আমাকে একটি ঔষুধ শুঁকালেন, আর সাথে সাথে আমি সুস্থ হয়ে উঠলাম।
ইবনে আবুদ্দিনার ও ইবনে আসাকিরও এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন।
[তথ্যসূত্রঃ মাকামে সাহাবা ও কারামতে সাহাবা]

Monday, 29 August 2016

নবীজী(সাঃ)কে মেঘের ছায়া প্রদান


চাচা আবূ তালিব বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে সিরিয়ায় যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলেন। সে সয়ম দাদা আবদুল মুত্তালিব গত হয়েছেন। বালক রাসূলুল্লাহ্ (সা) চাচার পরিবারভুক্ত হয়ে আছেন।
আবূ তালিব যখন রওয়ানা হবেন, চাঁদের মত সুন্দর বালক মুহাম্মদ (সা) এসে আবূ তালিবের জামার আস্তিন ধরে দাঁড়ালেন। ভাতিজার দিকে চেয়ে তিনি বললেনঃ ওকে ছাড়া আমি থাকতে পারব না, আমাকে ছাড়া সেও থাকতে পারবে না। ওকে আমার সাথে নিয়ে যেতে হবে। রাসূলুল্লাহ্ (সা) এভাবে আবূ তালিবের বাণিজ্য কাফেলার অন্তভুক্ত হলেন।
সিরিয়ার বুসরা একটি বিখ্যাত এলাকা। অন্যানা বারের মত কাফেলা এখানে যাত্রাবিরতি করল। এখানকার বিখ্যাত খৃস্টান গির্জায় বাহিরা নামক একজন সাধক পাদ্রী থাকতেন। এ বিশাল এলাকার লোকজন ধর্মজ্ঞান ও সাধনার জন্য তাঁর প্রতি খুবই শ্রদ্ধাশীল ছিল। এ গির্জায় দীর্ঘদিনের পুরানো এক আসমানী গ্রন্থ রক্ষিত ছিল। সে যুগে এটিকেই একমাত্র ঐশী জ্ঞানের আধার বলে মনে হতো।
সাধক বাহিরার বৈশিষ্ট ছিল, তিনি লোকসমক্ষে বের হতেন না। কথাবার্তাও বলতেন না। এবার মক্কায় এ কাফেলা যখন এ গির্জার অনতিদূরে যাত্রাবিরতি করল, আশ্চার্যজনকভাবে বাহিরা এ কাফেলার জন্য আপ্যায়নের প্রচুর ব্যবস্থা করলেন। প্রকৃত ব্যাপার ছিল, প্রচন্ড রোদের ভিতর দিয়ে এ কাফেলা যখন গির্জার দিকে এগিয়ে আসছিল, বাহিরা তখন অলস চোখে সেদিকে তাকিয়েছিলেন। হঠাৎ তিনি একটি অত্যাশ্চার্য দৃশ্য দেখে চমকে উঠলেন। তিনি দেখলেন, একখন্ড ঘন মেঘ কাফেলার মধ্যকার অনিন্দ্য সুন্দর এক কিশোরের উপর ছায়া বিস্তার করে সাথে সাথে আসছে। অবাক হয়ে বাহিরা গভীর মনোযোগের সাথে তা দেখতে লাগলেন।
কাফেলা যখন গির্জান কাছে একটি বড় বৃক্ষের নিচে ক্যাম্প করল, গাছের একটি শাখা ইষৎ নত হয়ে ঐ কিশোরের উপর পরিপূর্ণ ছায়া দান করে স্থির হয়ে রইল। ঐ চলন্ত মেঘ খন্ডটিও তাঁর উপর স্থির হয়ে থাকল। বাহিরা ভোজের আয়োজন করলেন। বাহিরা তাঁর সুদীর্গকালের নিয়ম ভেঙে গির্জা থেকে বের হয়ে এলেন এবং লোক পঠিয়ে কাফেলার লোকদের দাওয়াত করলেন। বলে পাঠালেন, আমি আপনারদের ছোট-বড়, আযাদ-গোলাম সকলেই এ ভোজে শামিল হওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। আমার এখানে খাদ্যগ্রহণ করে আপনারা আমাকে বাধিত করিবেন।
কাফেলার একজন অবাক হয়ে বললেনঃ জনাব! আপনি আজ আপনার দীর্ঘকালের অভ্যাসের ব্যতিক্রম করে অভিনব কাজ করলেন। কতবার এ পথে যাতায়াত করেছি, আপনাকে তো কখনও গির্জার বাইরে বের হতে দেখিনি বা এরুপ কারও জন্য ভোজের ব্যবস্থা করতেও দেখিনি।
বাহিরা প্রকৃত ব্যাপার এড়িয়ে গেলেন। বললেনঃ আজ যেহেতু আপনারা আমার খুব কাছাকাছি যাত্রাবিরতি করলেন, তাই আপনারা আমার মেহমান। খাদ্য তৈরি হচ্ছে, আপনারা তা গ্রহণ করবেন, এ আমার অনুরোধ। কাফেলার লোকেরা খেতে গেল। মালামাল প্রহরার প্রয়োজনে এবং অল্পবয়সী বিধায় রাসূল (সা) গাছের নিচেই রয়ে গেলেন।
বাহিরা গির্জা থেকে বের হয়ে এলেন। তীক্ষ্ণ চোখে কাছ থেকে সকলকে জরিপ করে তিনি হতাশ হলেন। বললেনঃ হে কুরায়শী মেহমানগণ! আপনারদের মাঝে কেউ কি এখানে আসতে বাকি রয়ে গেছে ? লোকেরা বললঃ আসার মত যারা সকলেই এসে গেছে। কেবল একজন বালক রয়ে গেছে। বাহিরা চমকে উঠলেন। বললেনঃ কক্ষণও না। কাউকেই দয়া করে বাকি রাখবেন না। কুরায়শের এক সরদারও তীক্ষ্ণ কন্ঠে বলে উঠলো, লাত ও উজ্জার কসম! আবদুল মুত্তালিবের পৌত্র কাফেলার আছে অথচ আমাদের সাথে ভোজে শরীক হবে না এ কখনও হতে পারে না। এটা আমাদের সকলের জন্য বড় নিন্দনীয় ব্যাপার। এ সরদার নিজেই উঠে গিয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে কোলে করে নিয়ে এলো এবং খাদ্যের সামনে বসিয়ে দিল।
এবার কাছ থেকে বাহিরা তাঁকে গভীরভাবে নিরীক্ষণের সুযোগ পেলেন। পূর্ববর্তী আসমানী গ্রন্থগুলো সম্পর্কে তার অসাধারণ ইলেম ছিল। সেগুলোর মাঝে শেষ রাসূল সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী ও বিশেষ বিশেষ লক্ষণসমূহের বিস্তারিত বর্ণনা বিদ্যমান ছিল। বাহিরার অন্তরে সব কিছু স্পট হয়ে গেল। খুশিতে আত্মহারা হলেন তিনি।
সকলে খেয়েদেয়ে চলে যাওয়ার সময় রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে এসে তিনি বসলেন। গম্ভীর স্বরে বললেনঃ “বালক! আমি তোমাকে লাত ও উজ্জার কসম দিয়ে বলছি- আমার কিছু প্রশ্নের তুমি জবাব দেবে।” বাহিরা জনৈক কুরায়শীকে ইতিপূর্বে লাত ও উজ্জার কসম দিতে শুনেছিলেন, তাই এরুপ বললেন। কিশোর রাসূলুল্লাহ্ (সা) বাধা দিয়ে বললেনঃ আমাকে এ লাত ও উজ্জার কসম দিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করবেন না। আল্লাহর কসম, এ দেবতাদের আমি সবচেয়ে ঘৃণা করি। বাহিরা বললেনঃ বেশ তো আল্লাহর কসম বলছি। রাসূল (সা) বললেন ঃ ঠিক আছে, কি জানতে চান বলুন। বাহিরা তাঁকে অনেক কথা জিজ্ঞেস করলেন। খাওয়া-দাওয়া ও ঘুমের বিভিন্ন অভ্যাসের কথা জিজ্ঞেস করে জানলেন। দেহের গঠন-প্রকৃতি বিশেষভাবে লক্ষ্য করলেন। বিশেষত তাঁর পৃষ্টাদেশ দেখলেন। তাতে মোহরে নবুওয়াত বর্ণিত মতে দেখতে পেলেন। বিস্ময়ে আনন্দে বিহবল হয়ে বাহিরা দেখলেন, সবই পূর্ববর্তী আসমানী গ্রন্থসমূহের বর্ণনার সাথে সম্পূর্ণ মিলে গেছে।
তারপর বাহিরা আবূ তালিবকে কাছে ডেকে জিজ্ঞেস করলেনঃ ছেলেটি কে ? আবূ তালিব বললেনঃ আমার। বাহিরা বললেনঃ কিন্তু এ ছেলের তো পিতা জীবিত থাকার কথা নয়। আবূ তালিব বললেনঃ “আসলে সে আমার ভাতিজা।” বাহিরা জিজ্ঞেস করলেনঃ তাঁর পিতার কি হয়েছে ? বললেনঃ তার মায়ের পেটে থাকা অবস্থায়ই পিতা ইন্তিকাল করেন।
চমৎকৃত হয়ে বাহিরা বললেন, এরকমই তো হওয়ার কথা। আপনি আপনার ভাতিজাকে নিয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দেশে ফিরে যান। ইহুদীদের থেকে তাকে সাবধানে আগলে রাখবেন। আল্লাহর কসম ! ওরা যদি একে দেখতে পায় এবং নিদর্শনাবলি থেকে আমি যেমন চিনতে পেরেছি ওরাও তেমনি চিনে ফেলতে পারে তবে ওরা এ বালকের ক্ষতি করার সমূহ চেষ্টা করবে। কারণ আপনার ভাতিজাই ভবিষ্যত মানবজাতির পথপ্রদর্শক-নবী। একথা শুনে আবূ তালিব সেখানেই দ্রুত তাঁর মালামাল বিক্রয় করে দিলেন। আশাতীত মুনাফা হলো এবং রাসূলুল্লাহ (সা)-কে নিয়ে দ্রুত দেশে ফিরে এলেন।
তথ্যসূত্র
• মাদারেজুন্নাওয়াত
• রাসুলুল্লাহ (সঃ) এর জীবনে আল্লাহর কুদরত ও রুহানিয়াত (লেখকঃ মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুল গফুর হামিদী, প্রকাশকঃ ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ)

Thursday, 21 July 2016

মানত ভঙ্গ করার পরিণতি


ফরিদপুর জেলার এক কৃষক, যিনি বিশ্বওলী খাজাবাবা ফরিদপুরীর (কুঃ ছেঃ আঃ) একজন মুরীদ, দরবার শরীফে গিয়ে হযরত কেবলাজন হুজুরের কাছে অতি উদ্বেগের সাথে নালিশ জানালেন যে, তিনি তার জমিতে বেগুনের চাষ করেন। কিন্তু ঝাঁকে ঝাঁকে বুলবুলি পাখি এসে সব বেগুন খেয়ে ফেলে, নষ্ট করে ফেলে। লোকটির নালিশ শুনে পীর কেবলাজান খুব অবাক হয়ে মধুর কন্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন, “কেন বাবা? বুলবুলি পাখি আপনার বেগুন ক্ষেত নষ্ট করে ফেলে কেন?”
আগত জাকের ভাই এবার বিস্তারিত সব ঘটনা খুলে বললেন, “ হুজুর, আমি জমিতে বেগুনের চাষ করে নিয়্যত করেছিলাম যে, প্রথম ফলনের সব বেগুন হুজুর পাকের দরবারে নজরানা হিসেবে দিয়ে দেব। কিন্তু প্রথম ফলন খুব ভাল হওয়াতে এবং বেগুনের দামও হঠাত খুব বেড়ে যাওয়াতে নিয়্যত পাল্টে ফেলে মনে মনে ঠিক করলাম যে, এবার না হয় দরবার শরীফে বেগুন নাইবা দিলাম। ভালো মূল্যে এবারের বেগুন গুলো বিক্রি করে পুজি বাড়িয়ে পরবর্তী বছরে বেগুন দরবার শরীফে দিয়ে দেব”। এ পর্যন্ত বলে চাষী একটু ঢোক গিললেন। পরের কথা গুলো বলার আগে হুজুর পাকই জিজ্ঞাসা করলেন, “তারপর কি হলো বলেন।” বেগুন চাষী জাকের ভাই জানলেন যে, দ্বিতীয় দফায় বেগুন গাছে ফুল ধরতে শুরু করলো, তখন কোথা থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে বুলবুলি পাখি এসে তার ক্ষেতের বেগুন ফুল খাওয়া শুরু করল। ফলে সেবার ফলনও খুব কম হলো। তাই সেবারও নিয়্যত পাল্টে সিদ্ধান্ত নিলেন যে, এত কম ফলনের বেগুন দরবারে না দিয়ে পরর্বতী ফলনে (তৃতীয় দফায়) যে বেগুন হবে সেগুলো হুজুর পাকের দরবারে নজরানা হিসেবে দিয়ে দেবেন, আর এতে কোন অন্যথা করবেন না। কিন্তু পরবর্তী দফায় হতভাগ্য বেগুন চাষীর কপালের দূর্ভোগ আরো বেড়ে গেল। এবার আগের চেয়েও অনেক বেশী সংখ্যক বুলবুলি পাখি ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে এসে বেগুনের শুধু ফুলই নয়, ফুল শুদ্ধ গাছের ডগা পর্যন্ত খেয়ে ফেলল।
ঠোকর দিয়ে সব গাছ একেবারে ছিন্নভিন্ন করে ফেলল। ফলে বেগুন চাষী এখন সর্বস্বান্ত হবার পথে। তাই তিনি বাধ্য হয়ে খাজাবাবা ফরিদপুরী (কুঃ ছেঃ আঃ) স্মরণাপন্ন হয়েছেন। উদ্দেশ্য, খাজাবাবা যেন দয়া করে এ মহা মছিবত থেকে উদ্ধারে তার জন্য আল্লাহর দরবারে দু‘আ করেন।
সব শুনে হযরত কেবলাজান হুজুর আপন স্বভাবজাত মধুর সুরে বিস্ময়ের কন্ঠে বললেন, “বাবা, বুলবুলি পাখি যে আপনাকে শুদ্ধ খেয়ে ফেলেনি, এটাই আপনার পরম সৌভাগ্য। ওলী আল্লাহদের সাথে মুনাফেকী করা ঠিক নয়”।
(তথ্যসূত্রঃ বিশ্বওলী খাজাবাবা ফরিদপুরী(কুঃ) ছাহেবের কতিপয় অবিস্মরনীয় কারামত)

Monday, 18 July 2016

মায়ের মমতা এবং হযরত সোলায়মান(আঃ)-এর বিচক্ষণতা



নবী হযরত দাউদ (আঃ) এর যামানার ঘটনা। দুইজন মহিলা তাহাদের নিজ নিজ কোলে একটি করিয়া শিশু বহন করিয়া কোথাও যাইতেছিল। পথিমধ্যে এক মহিলা বাঘের আক্রমণের মুখে পতিত হইয়া স্বীয় শিশুটি হারাইল।নিজের শিশু হারাইয়া কি করিবে কিছু স্থির করিতে না পারিয়া তাহার সঙ্গী মহিলাটির কোল হইতে উহার শিশুটিকে ছিনিয়া নিয়া বলিল, এই শিশুটি আমার। তোমার শিশু বাঘে নিয়া গিয়াছে। উভয়ের মধ্যে খুব বাচসা ও কথা কাটাকাটি হইল। পরিশেষে উহারা উভয়ে নবী হযরত দাউদ (আঃ) এর দরবারে উপস্থিত হইয়া একে অপরের বিরুদ্ধে নালিশ জানাইল।
নবী হযরত দাউদ (আঃ) বিচার শেষে সেই কুচক্রী মহিলাটিকে শিশুটি দিয়া দিলেন। এই খবর শুনিয়া তাহার ছেলে হযরত সোলায়মান (আঃ) স্বীয় পিতার নিকট বলিলেন, “আব্বাজান! এই ব্যাপারে আমার নিকট একটি চমতকার সমাধান আছে, আপনি অনুমতি দিলে শুনাইতে পারি।” নবী হযরত দাঊদ (আঃ) অনুমতি দিলে হযরত সোলায়মান (আঃ) বলিলেন, আমি শিশুটিকে এখনই দুই টুকরা করিয়া অর্ধেক করে উভয়ের মধ্যে বন্টন করিয়া দিব।” এই ফয়সালা শুনিয়া কুচক্রী মহিলাটি নিশ্চুপ রহিল। আর শিশুর আসল মাতা বলিয়া উঠিল, “ হুযুর! শিশুটি উহাকে দিয়া দিন। আল্লাহর কসম দিতেছি শিশুটিকে দুই টুকরা করিবেন না।” তখন হযরত সোলায়মান (আঃ) বলিলেন, শিশুর আসল মাতা হইল এই রমণীই। যাহার অন্তরে মাতৃ মমতা নিহিত রহিয়াছে, সেই উহাকে দ্বিখন্ডিত করনের ফয়সালায় বাধা হইয়া নিজ দাবী পরিত্যাগ করিয়াছে। অতঃপর শিশুটিকে তাহার আসল মাতার নিকট অর্পণ করিলেন।
তথ্যসূত্রঃ
* মিশকাত শরীফ- ৫০০ পৃঃ
* ফতহুল বারী দ্বাদশ খন্ড- ২৬৮ পৃঃ
* ইসলামের জীবন্ত কাহিনী- ১০০ পৃঃ

Sunday, 3 July 2016


¤.বিশ্বনবী (সাঃ) একদিন বাহির থেকে এসে তাঁর নাতি হাসান এবং হোসাইনকে আদর করছিলেন।হঠাৎ হোসাইন (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেন, বলেনতো নানা আপনি বড় নাকি আমি বড়? রাসূল(সাঃ) হেসে বললেন,"দুনিয়ার সকল মানুষের নেতা আমি।সেজন্য আমিতো অবশ্যই বড়"কিন্তুছোট্ট হোসাইন বললেন,না নানা,আমি আপনার চেয়ে বড়।
রাসূল(সাঃ) বললেন, "তুমি আমারচেয়ে বড়, এটার যুক্তি দেখাওতো?
"ছোট্ট হোসাইন বললেন,দেখি আপনার বাবার নামকি বলেন?
রাসূল (সাঃ) বললেন আবদুল্লাহ।
.
হোসাইন বললেন, শুধুই আবদুল্লাহ। আগেও কিছু নাই,পরেও কিছু নাই। আমার বাবার নামকি জানেন ? আমার বাবার নাম আসাদুল্লাহিল গালিব, আলী ইবনে আবি তালিব,সারা দুনিয়ার কাফিরদের যম।আপনি এমন এক আব্বা পেয়েছেন কি?তাহলে তো আমিই আপনার চেয়ে বড়।রাসুল (সাঃ) অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন হোসাইনের দিকে।.হোসাইন (রাঃ) বললেন,নানা এখানেই শেষ নয়। দেখি আপনার আম্মার নামকি বলেন।
রাসূল (সাঃ) বললেন,আমিনা।
.হোসাইন বললেন, শুধুই আমিনা।আর আমার আম্মার নামকি জানেন? আমার আম্মার নাম হলো,ফাতিমাতুজ জাহরা, জান্নাতের সর্দারীনী। এরকম একটি আম্মা কি আপনি পেয়েছেন? তাহলেতো এদিক দিয়েও,আমি আপনার চেয়ে বড়।রাসূল (সাঃ) আবারো অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। হোসাইন আবার বললেন,নানা এখানেই শেষ নয় আরো আছে। দেখি বলুনতো আপনার নানির নামকি? রাসুল (সাঃ) তাঁর নানির বললেন।এবার হোসাইন বললেন, "আমার নানির নাম কি জানেন? আমার নানির নাম হলো,খাদিজাতুল কোবরা,জান্নাতে প্রথম মহিলা হিসেবে প্রবেশ করবেন।এরকম নানি কি আপনি পেয়েছেন? তাহলে তো এখান দিয়েও আমি আপনার বড়" .রাসূল (সাঃ) নিজের চোখের পানি ছেড়ে দিলেন।.হোসাইন বললেন,নানা আরো আছে আরো আছে।বলুনতো আপনার নানার নাম কি??রাসূল (সাঃ) উনার নানার নামবললেন।এবার হোসাইন বললেন, আমার নানার নাম কি জানেন? আমার নানার নাম হলো রহমাতুল্লিল আ'লামিন,বিশ্বনবী মোস্তফা হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)এই রকম একজন নানা কি আপনি পেয়েছেন??? তাহলে আপনি নিজেই বলুন,কে বড়? আপনি বড়নাকি আমি বড়?.
রাসূল (সাঃ) হোসাইনকে শক্তকরে জড়িয়ে ধরে বললেন,হ্যাঁ হোসাইন।
আল্লাহ আজ তোমাকে আমার চেয়ে বড় বানিয়ে দিয়েছেন।.


Tuesday, 21 June 2016

বনের পশু কামেল পীরের কথা শুনে


ফরিদপুর জেলার বাহাদুরপুর এলাকার একজন চাষী তার দুই বিঘা জমিতে আখের চাষ করে সন্তান-সন্ততি ও পরিবার-পরিজন নিয়ে কোনমতে জীবিকা নির্বাহ করতেন। কিন্তু এক পর্যায়ে তার আখ ক্ষেতে ভীষন শিয়ালের উপদ্রব শুরু হলো। প্রতি রাতে দলবদ্ধ ভাবে শিয়াল ক্ষেতের আখ খেয়ে ফেলে। নানা কৌশল অবলম্বন করেও শিয়ালের আক্রমন থেকে ক্ষেতের আখ রক্ষা করা যাচ্ছেনা দেখে খুব শক্ত করে ক্ষেতের চারদিকে বেড়া দিলেন।
কিন্তু এতে ফল হলো উল্টো। শিয়ালের আক্রমন আরো বেড়ে গেল। এখন দলে দলে অনেক শিয়াল একত্রে এসে ক্ষেতের বেড়া ভেঙ্গে আগের চেয়েও বেশি আখ নষ্ট করে ফেলতে লাগলো। বেচারা গরীব চাষী একেবারে নিঃস্ব হওয়ার পথে। শেষ পর্যন্ত কোন উপায় না দেখে একজনের পরামর্শে আটরশির বিশ্ব জাকের মঞ্জিলে গিয়ে যামানার মহা ইমাম, মহা মুজাদ্দেদ বিশ্বওলী হযরত শাহসূফী খাজাবাবা ফরিদপুরী (কুঃ ছেঃ আঃ) কেবলাজন হুজুরের কাছে তার দুরাবস্থার কথা জানালেন এবং শিয়ালের উপদ্রব থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য হুজুর কেবলাজানের দয়া ভিক্ষা চাইলেন। লোকটির অসহায় অবস্থার কথা শুনে মানব দরদী, কামেল মোকাম্মেল ওলী খাজাবাবা ফরিদপুরী (কুঃ ছেঃ আঃ) ছাহেব অত্যন্ত মধুর কন্ঠে আগত চাষীকে এক অভিনব এবং আশ্চর্য উপদেশ দিয়ে বললেন,“ বাবা আপনি গিয়ে আখ ক্ষেতের বেড়া খুলে দিবেন। তার পর আবার যখন শিয়াল আসবে তখন আপনি শিয়ালদের দলপতিকে উদ্দেশ্যে করে খুব বিনয়ের সাথে বলবেন, দেখেন আমি খুব গরীব মানুষ। এই আখ ক্ষেতের আখ বিক্রি করেই আমার স্ত্রী-পুত্র পরিজন নিয়ে কোনমতে বেঁচে আছি। আপনারা আমার আখ ক্ষেতের আখ খেয়ে ফেললে আমি ছেলে মেয়ে নিয়ে বাঁচবো কি করে? তাই আমার অনুরোধ আপনারা এসে দু চারটা আখ খেয়ে চলে যাবেন। এ পর্যন্ত বলেই কেবলাজন হুজুর তাকে নির্দেশ দিলেন, “যান বাবা, যেভাবে বললাম সেভাবে কাজ করেন গিয়ে।”
অতঃপর বাহাদুরপুরের সেই আখচাষী বাড়ীতে গিয়ে ক্ষেতের বেড়া খুলে দিলেন এবং রাতের বেলায় শিয়ালের আগমনের প্রতিক্ষায় থাকলেন। এক সময় দলপতির নেতৃত্বে একদল শিয়াল আখ ক্ষেতে এসে ঢুকে পড়বে, ঠিক সেই সময় উক্ত চাষী হযরত কেবলাজান হুজুরের শেখানো কথা গুলোই দলপতিকে উদ্দেশ্য করে বললেন। এতে আশ্চর্য কাজ হলো, শিয়ালগুলো আখ ক্ষেত ছেড়ে চলে গেল। আর কখনো দু‘চারটি আখ খেতেও আসেনি।
বিশ্বওলী, মহাওলী, শতাব্দীর মহা কামেল হযরত শাহসূফী ফরিদপুরী (কুঃ ছেঃ আঃ) ছাহেব এভাবে বনের পশুকেও বশীভুত করার বিস্ময়কর কৌশল অতি সাধারণ মানুষকেও শিখিয়ে দিয়ে গেছেন। একমাত্র বিশ্বাসী আশেক হৃদয় ছাড়া মাশুকের প্রেমের খেলা বুঝতে পারেনা।
(তথ্যসূত্রঃ বিশ্বওলী খাজাবাবা ফরিদপুরী (কুঃ ছেঃ আঃ) এর কতিপয় অবিস্মসরণীয় কারামত, শিকদার তোফাজ্জল হোসেন।)

Tuesday, 7 June 2016

আল্লাহর অলীদের আনুগত্য করা ফরয



بسم الله الرحمن الرحيم

                            
আল্লাহ তায়ালার বাণী:        واصبو نفسك مع الذين يدعون ربهم بالفد وات والعشئ الخ ا                   (ওয়ার্ছ্বি নাফ্সাকা মাআল্লাযীনা ইয়াদ্উনা রাব্বাহুম বিল্গুদুওয়্যাতি ওয়াল শিয়্যে) অর্থাৎ, যারা সকাল সন্ধ্যায় আপন প্রভুকে ডাকে: আপন মনপ্রাণ তাঁদের সাথে ঠেকিয়ে রাখ অর্থাৎ যাঁরা আল্লাহকে স্মরণ করেন তাঁদের আজ্ঞা পালন কর এবং তাঁদের অনুগত হয়ে যাও কারণ ফকির অলীদের আনুগত্য করা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ রাসূলের আনুগত্য করারই নামান্তর কারণে হাদীস শরীফে বলা হয়েছে: تخلقوا باخلاق الله (তাখাল্লাকু বিআখ্লাকিল্লাহ্) অর্থাৎ, আল্লাহর চরিত্রে চরিত্রবান হও অলী-নবীদের চরিত্রও তাই সুতরাং যার মধ্যে আল্লাহর চরিত্রগুণ বিদ্যমান, তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা-ভক্তি সম্মান প্রদর্শন করা ওয়াজিব আর এটা অলঙ্ঘনীয় ওয়াজিব এটা ফরজের স্থলে শর্তসাপেক্ষ ওয়াজিব নয় যে, শর্ত অপসারিত হলে ওয়াজিবও অপসারিত হয়ে যাবে উদাহরণস্বরূপ যাকাত প্রদান ওয়াজিব, কিন্তু যাকাত আদায় করার পর তা আর ওয়াজিব থাকে না অপরদিকে অলীদের আনুগত্য করা মৌলিক এবং অলঙ্ঘনীয় ওয়াজিব, ফরজের চেয়েও অধিক গুরুত্ববহ কারণ এরূপ স্থায়ী ওয়াজিব থেকেই ফরয অন্যান্য হুকুম-আহ্কাম বের হয় কারণ সার্বক্ষণিক ওয়াজিব কখনো অপসারিত হয় না যেমন আল্লাহ-রাসূল এবং অলীদের প্রতি বিশ্বাস রাখা ওয়াজিব, আর কিয়ামত পর্যন্তই এটা ওয়াজিব এমনিভাবে প্রমাণিত মৌলিক ওয়াজিবসমূহ পালন করাও সার্বক্ষণিক ওয়াজিব
মোটকথা, ফকির-অলীদের আনুগত্য করা ওয়াজিব তাঁদের কোনো কাজ শরিয়ত বিরোধী মনে হলেও তা কেবল বাহ্যিক, কিন্তু অন্তর্নিহিত শরিয়ত বা আল্লাহ তায়ালার বিরোধী নয় আহলে জাহেরগণ বাহ্যিক শরিয়তের ওপর নির্ভরশীল অথচ দৃশ্যত যা বৈধ ভালো মনে হয়, প্রকৃতপক্ষে তা বিপরীতও হয় উদাহরণস্বরূপ, রক্ত এবং মণি প্রভৃতি বাহ্যতঃ অপবিত্র কিন্তু অন্তঃসারের বিচারে পবিত্র কারণ উহা দ্বারা পবিত্র মানুষ সৃষ্টি হয় অনুরূপ যে কোনো অবস্থাতেই স্ত্রী সঙ্গম বৈধ এবং কারও কাছে বললে গালির মতো শোনায় আল্লাহর অলীদের কাজকেও এভাবেই বিচার করতে হবে
হযরত খিজির (আঃ)-এর ঘটনা গভীরভাবে চিন্তা করুন সংক্ষেপে তা হল এই যে, হযরত খিজির (আঃ) সতর্কতামূলকভাবে হযরত মূসা (আঃ)-কে অঙ্গীকার করিয়ে নিয়েছিলেন যে, আমার কোনো কাজে আপনি আপত্তি করবেন না যদি করেন তাহলে আমার থেকে আলাদা হয়ে যাবেন হযরত মূসা (আঃ) বললেন, ইনশা আল্লাহ আমি অবশ্যই কথায় বহাল থাকব অতঃপর হযরত খিজির (আঃ) নদীর তীরে গেলেন সেখান থেকে মালিকের অনুমতি ছাড়াই একটি নৌকা নিয়ে নদী পার হলেন এবং পরে স্বীয় লাঠির আঘাতে নৌকাটি ভেঙে নদীতে ডুবিয়ে দিলেন হযরত মূসা (আঃ) দেখলেন এটা সম্পূর্ণ শরিয়তবিরোধী কাজ কারণ মালিকের অনুমতি ছাড়া কোনো জিনিস নেওয়া অবৈধ তদুপরি উহা ভেঙে ডুবিয়ে দেয়া হয়েছে এবং অদৃশ্য করে ফেলা হয়েছে একই ঘটনায় তিন চারটি নিষিদ্ধ কর্ম বা হারাম কাজ হল, তাই হযরত মূসা (আঃ) আপত্তি উত্থাপন করলেন যে, আপনি এসব শরিয়তবিরোধী কাজ করেছেন তখন হযরত খিজির (আঃ) বললেন, আমার কাছ থেকে আপনি এখনি বিদায় হোন হযরত মূসা (আঃ) বিনীতভাবে অপরাধ ক্ষমা চাইলেন এবং কথা দিলেন, আর এমন হবে না অতঃপর সেখান থেকে এগিয়ে পথে একটি ছেলেকে স্বীয় লাঠির আঘাতে খিজির (আঃ) মেরে ফেললেন হযরত মূসা (আঃ) আবারও এতে আপত্তি করেন নূরানী বক্ষ হযরত খিজির (আঃ) রেগে গিয়ে বললেন, আপনি আমার থেকে বিদায় হোন হযরত মূসা (আঃ) আবারও ক্ষমাপ্রার্থী হলেন হযরত খিজির (আঃ) তাঁকে নিয়ে এগিয়ে গেলেন পথে একটি ভাঙা দেয়াল পেয়ে দিনব্যাপী মেরামত করে দিলেন কাজ কেউ তাঁকে করতেও বলেনি বা এজন্য তিনি কোনো পারিশ্রমিকও পাননি একান্ত স্বেচ্ছায় কাজটি করেছেন মূসা (আঃ) আবার প্রতিবাদ করলেন, নূরানী বক্ষ হযরত খিজির (আঃ) তাঁকে আলাদা হতে বললেন, এবার আপনার বিদায়ের পালা কারণ আমার কাজ আপনার অপছন্দ এবং আপনি গোপন জ্ঞান সম্পর্কে অজ্ঞ প্রকৃতপক্ষে জাগতিক নবীর ধৈর্যও নেই তখন হযরত মূসা (আঃ) আরজ করলেন, আপনি নৌকা ভাঙলেন, এর রহস্য কী? উত্তর দিলেন, জনৈক জালিম বাদশা আসছিল, সে নৌকার মাঝি-মাল্লা সকলকে ধরে নিয়ে যেত তাই এটাকে ডুবিয়ে দিয়েছি যেন বেচারার নৌকা নিজেই পেয়ে যায় এবং নৌকা দ্বারা গরিবরা তাদের জীবিকা অর্জন করতে পারে নাবালকটাকে হত্যা করার রহস্য হল ছেলেটা ডাকাত হত, তার পিতা-মাতাকে কষ্ট দিত এবং আল্লাহর অবাধ্য হত এজন্য আমি তাকে হত্যা করেছি অতঃপর তার আর একটি ভগ্নি জন্মগ্রহণ করবে এবং তার আওলাদদের মধ্যে সত্তর জন নবী জন্ম নিবেন আর দেয়াল মেরামতের মাধ্যমে আমি জনৈক অনাথকে সাহায্য করেছি দেয়ালের নিচে তার পিতার অনেক সম্পদ লুকায়িত আছে দেয়ালটি পড়ে গেলে সে সম্পদ অন্যে নিয়ে যেত আক্ষেপ সব বিষয়ে আপনি মোটেই অবহিত নন এবং আপনার কোনো অদৃশ্য জ্ঞানও নেই আপনি যদি আমার কাজে আপত্তি উত্থাপন না করতেন, তাহলে অনুরূপ হাজারও বিষয়ে আপনাকে শিক্ষা দিতাম এখানে চিন্তার বিষয় এই যে, হযরত মূসা (আঃ) নবী হয়েও নিজের ওয়াদা ভঙ্গ করেছেন এবং আপত্তি উত্থাপন করেছেন প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তায়ালা গোপন জ্ঞান শিক্ষার জন্য নূরানী বক্ষ হযরত খিজির (আঃ)-এর নিকট তাঁকে প্রেরণ করেছিলেন এতদসত্ত্বেও তিনি বাহ্যিক শরিয়তের অনুসরণ করেন এবং নূরানী বক্ষ হযরত খিজির (আঃ)-এর কার্যাদি খারাপ দোষণীয় মনে করেন তিনি এটা চিন্তাই করেননি যে, যেহেতু আল্লাহ আমাকে তাঁর কাছে পাঠিয়েছেন, সেহেতু তাঁর তাক্লীদ বা অনুসরণ করা আমার কর্তব্য এবং তাঁর সাথে বিরোধ করা অনুচিত এজন্যই ফকির এবং অলীদের কোনো কাজ শরিয়তের ঘোর বিরোধী মনে হলেও, তাঁদের আনুগত্য করতে হবে কারণ অলীদের হাত আল্লাহর হাতে স্থাপিত আল্লাহ যা করান তা- তাঁরা করেন, যদিও দৃশ্যত তা আপত্তিকর মনে হয় যেমন কোনো অলী দেখলেন যে কোনো ব্যক্তির ওপর অদৃশ্য বিপদ আসছে, তখন তিনি তার কিছু মালামাল তার অনুমতি ছাড়াই সরিয়ে নিলেন এবং যতদিন না তার বিপদ কেটে যায়, ততদিন তা নিজের কাছে রেখে দিলেন এটা চুরি হবে না, বরং এটা হবে মালের মালিকের প্রতি দয়া প্রদর্শন কারণ সে সময় সে মারাত্মক ক্ষতির শিকার হয়েছিল তার মালের কিছু অংশ অলী নেওয়ার বদৌলতে আল্লাহ তা নিরাপদে রেখেছেন এভাবে আল্লাহর অনেক অলী সময় সময় দৃশ্যত শরিয়তবিরোধী বহু অপ্রয়োজনীয় কাজও করে থাকেন কখনো লোকদের গালি দেন গালিরও অর্থ আছে সময় বিশেষে কাউকে লক্ষ করে গালি দিলেও আসলে বিপদ-আপদকেই গালি দেওয়া হয় উদ্দেশ, যাতে তার বিপদ-আপদ দূর হয়ে যায় লক্ষণীয়, যে ভালো করতে চাচ্ছে, আমরা তাঁর দুর্নাম করছি হযরত খিজির (আঃ) নৌকা ডুবিয়ে দিয়েছেন, নৌকার মালিক দেখলে অবশ্যই তাঁকে চোর মনে করত অনুরূপভাবে কোনো কোনো ফকির পতিতার ঘরে যাতায়াত করেন. কখনো কখনো মন্দিরেও যান এতেও রহস্য আছে এতে চতুর্দিকে প্রসারিত মূর্তির প্রভাব দমন হচ্ছে, অথবা অন্য রহস্যও আছে আল্লাহর কোনো কোনো অলী নেংটি পরিধান করেন, এরও তাৎপর্য আছে বিশেষত এর দ্বারা তাঁরা নিজের নফ্সকে লাঞ্ছিত করেন এবং লাঞ্ছনার বিনিময়ে অজস্র রহমত নেয়ামত লাভ হয় স্মরণীয় যে, নেংটি পরিধান করা তথা গুপ্তাঙ্গ ঢাকা মালিকী মাজহাবে ফরজ অথচ অলীদের মাজহাবে তো ফরজই নেই কারণ তাওহীদপন্থী যখন তাওহীদের সাগরে নিমজ্জিত হতে থাকেন, তখন বাহ্যিক শরিয়তের কোনো তোয়াক্কা থাকে না আওয়ারিফ এবং ফচুছ্ প্রভৃতি তাসাউফের কিতাব দ্রষ্টব্য তবে আল্লাহর অলীগণ সব সময়ই মঙ্গল করে থাকেন তাঁরা যেখানে থাকেন সেখানে আল্লাহর রহমত অবতীর্ণ হয় হাদীস শরীফে আছে যে, আল্লাহর অলীগণ পানাহার কথা বলার সময় রহমত নাযিল হয় অতএব তাঁদের সব কথাই রহমত মিশ্রিত তাঁরা যদি কাউকে মারেনও তাও রহমত
অলী দু প্রকার: মুতাসাওফিয়া এবং মালামাতিয়া মুতাসাওফিয়াগণ কদাচিৎ ছাড়া কখনো বাহ্যিক শরিয়তের খেলাফ কিছু করেন না কিন্তু মালামাতিয়াগণ দৃশ্যত শরিয়তের খেলাফ করেন যেমন: নেংটি পরা অথবা উলঙ্গ থাকা ইত্যাদি তবে অধিকাংশ গাউস-কুতুব-আবদাল এবং উত্তম ব্যক্তিত্ব এদের থেকেই আবির্ভূত হন এবং এরাই পৃথিবীর হিতাকাক্সক্ষী
আলমের বিবরণ                                                              
আলম একটি সুমহান স্থান যাকে আলম--মুতলাক বলা হয় কোনো কোনো হিসেবে আলম দুভাগে বিভক্ত যেমন: আলম--আমর এবং আলম--খাল্ক আবার কোনো হিসেবে আলম চার ভাগে বিভক্ত যেমন: নাসুত মালাকুত যাবারুত লাহুত অন্য হিসেবে আলম সাতটি: হাহুত ইয়াহুত বাহুত আর কোনো হিসেবে নয়টি: আহুত এবং হামিদা আবার কোনো হিসেবে আঠারোটি মোটকথা আলম--মুতলাক-এর উৎসের প্রেক্ষিতে নামের পার্থক্য হয়েছে অর্থাৎ আলম--জাত অর্থাৎ আলম--লাহুতের পরবর্তী স্তরসমূহ নিম্নক্রমে পরস্পর শাখা বিশেষ এবং উপরের আলম তথা হাকীকত--জাত ঊর্ধ্বানুক্রমে একে অন্যের উৎস কিন্তু জাতের শেষ নেই এর পরিপূর্ণ আলোচনা সম্ভব নয় তাছাড়া জাতে যা কিছু রয়েছে, তা জানা এবং দেখা কারও পক্ষে সম্ভব নয় তবে যে নিজেকে জানতে পারে এবং দেখতে পায় তার পক্ষে সব কিছু জানা দেখা সম্ভব কারণ সমগ্র বিশ্ব স্বীয় অজুদের অন্তর্ভুক্ত অর্থাৎ অজুদ সমগ্র জগৎই অজুদ আর জগতের মধ্যে অজুদই জগৎ উদাহরণস্বরূপ প্রত্যেকটি স্ফুলিঙ্গে আগুন অন্বেষণ করে, সে তো আগুনের সাথে স্ফুলিঙ্গ এবং স্ফুলিঙ্গের সাথে আগুনও পেয়ে থাকে অনুরূপভাবে অজুদ এবং জগৎ একটাই অজুদের বিচারে জগৎও অজুদ আর অজুদকে জগতের প্রেক্ষিতে বিচার করলে অজুদও জগৎ এটা যে জানে না, এমন লোকদের নিকট এসব কথা বলা না বলা সমান
জগতের রূপ                                                                  
জগৎ একটি হেকমতময় বীজ এর মধ্যে ফল, ফুল, বৃক্ষ, মগজ তৈল সবই বর্তমান এমনকি তা আঠারো হাজার সৃষ্টির জন্ম-পরিসর যেমন: একটা খোসার মধ্যে শত শত দানা আছে এবং প্রত্যেকটি দানার জন্য পৃথক পৃথক স্থান নির্ধারিত রয়েছে, আবার সে সবগুলো দানা রয়েছে একটি মাত্র সাধারণ স্থানে অতএব এরা সব মিলে এক আবার একই সব মৌলিক এবং অমৌলিক, প্রেক্ষিতে একের বহু হওয়া এবং বহু-এর এক হওয়া, একে অন্যের পরিপূরক এবং দৃশ্য জগতের মূল হল, আলম--জাত তথা লাহুত আবার আলম--লাহুত এর মূলকে বলা হয় আলম--হাহুত অনুরূপভাবে আলম--সিফাত অর্থাৎ, আলম--যাবারুত এবং মালাকুত প্রভৃতিও মূলের শাখা-প্রশাখা মাত্র অতএব, যা কিছু জগৎ মাঝে বিদ্যমান, তা সবই মানুষের মধ্যে বর্তমান জন্যই হাদিস শরীফে বলা হয়েছে, যে নিজেকে চিনেছে, সে তার প্রভুকেও চিনেছে কবর আযাব কথাটিরও একই অর্থ অর্থাৎ কবরের বড় বড় সাপ বিচ্ছু প্রভৃতি সবই স্বীয় দেহের প্রজাতি অর্থাৎ, স্বীয় দেহে বর্তমান বিষ থেকে বিভিন্ন ধরনের দংশনকারী জীব জন্মিবে এবং তাকে দংশন করবে মানুষের পেটে যেভাবে কৃমি জন্মগ্রহণ করে, সেভাবে মৃত দেহে নিজে নিজেই অনেক ধরনের পোকার জন্ম হয় শাস্তি শান্তি উভয়ই স্বীয় অজুদ অর্থাৎ সত্তা তথা রুহানী সত্তা জাত সময় তাদের মধ্যে রুহ্ প্রবিষ্ট করানো হলে ঐসব পোকার কারণে তাদের কষ্ট হবে পোকা, সাপ, বিচ্ছু যা কিছুই হবে তা সৃষ্টির বাইরে নয় ভালো হোক আর মন্দ হোক বীজ এটাই যেমন, মানুষ যখন শয়তানি করে, তখন তাকে শয়তান বলা হয় অর্থাৎ মানুষের মধ্যে শয়তানি এবং কুকুরের স্বভাব দেখা গেলেই তাকে শয়তান বা কুকুর ইত্যাদি নামে আখ্যায়িত করা হয় কারণে হাশরের দিন অনেক লোক বানর শূকর প্রভৃতির আকৃতিতে কবর থেকে উত্থিত হবে এর অর্থ হল, বহু আকৃতি-প্রকৃতির বীজ মানুষের স্ব-স্ব অজুদে তথা সত্তায় বর্তমান উদাহরণস্বরূপ মাটি থেকে বিভিন্ন প্রকার উদ্ভিদ, বৃক্ষরাজি এবং জঙ্গল প্রভৃতি জন্মলাভ করে মাটির সাথে সকল জিনিস প্রজাতির বীজ হিক্মত তথা বিজ্ঞানসম্মতভাবে একসঙ্গে মিশিয়ে উহাকে আটার রুটির মতো তৈরি করা হয়েছে কারণে ভূমি সৃষ্টি করে কয়েক হাজার বছর পর্যন্ত উহাতে বৃষ্টিপাত করা হয় অতঃপর কয়েক হাজার বছর ধরে উহাকে শুকানো হয় এভাবে বার বার এরকম করা হয়, ফলে সব জিনিসের বীজ পরিপক্ব হয়ে মাটির সাথে মিশে যায় এবং উহাতে শক্তি সঞ্চিত হতে থাকে পানি থেকে পর্যায়ক্রমে ভূমির উৎপত্তি হয়েছে: কথাটির অর্থ ভিন্ন কারণেই ভূ-পৃষ্ঠে নানা রকম বৃক্ষাদি, পাথর, রকমারি উদ্ভিদ এবং নানা শ্রেণীর জীবজন্তু জন্মগ্রহণ করেছে প্রত্যেকদিন আল্লাহ তায়ালা এগুলোকে সৃষ্টি করছেন না তবে আল্লাহ তায়ালা কোনো প্রজাতি থেকেই দূরে নন বা বিচ্ছিন্ন নন কেউ কেউ লিখেছেন যে, জ্ঞানের প্রেক্ষিতে আল্লাহ সকল বস্তুর সন্নিকটে এর অর্থ হল, তিনি সত্তাগত জ্ঞানসূত্রে এসবের কাছাকাছি কারণ সমস্ত বস্তুতেই অবশ্যম্ভাবীরূপে পরমসত্তা ব্যাপ্ত এবং সত্তার সাথে জ্ঞানও রয়েছে বিষয়ে অজ্ঞ ব্যক্তির কিছু লেখা না লেখা সমান
সুতরাং ভূমিকে হেয় জ্ঞান করা কারও উচিত নয় কারণ ভূমির উপাদান অনেক উচ্চতর মর্যাদাসম্পন্ন এবং মৌলিক নূর সিজ্দার নূর দ্বারা ভূমি সৃষ্টি করা হয়েছে তাই গোটা ভূ-বিশ্বকেই আল্লাহ মসজিদ আখ্যা দিয়েছেন এখানে স্বর্ণ-রৌপ্য-নবী-অলী এবং বিভিন্ন রকমের মূল্যবান প্রস্তরাদি জন্মে এসব বিষয়ে পরিপূর্ণতার ক্ষেত্রে মাটি অপ্রতিদ্বন্দ্বী শুধু দু একটি কারণেই নয়: সব দিক থেকেই মাটিকে আল্লাহ পছন্দ করেছেন পবিত্র জগতের সাথে মাটির কী সম্পর্ক: এটা যারা বলেন, তারা যদি এখানে মাটি দ্বারা ধুলোবালি এবং আবর্জনা বুঝিয়ে থাকেন, তাহলে ঠিক আছে অন্য কিছু বুঝিয়ে থাকলে তা ঠিক নয় কারণ আল্লাহ তায়ালা মাটি থেকেই তাঁর বন্ধুদের সৃষ্টি করেছেন এবং এতে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর পবিত্র নূর যুক্ত রয়েছে মাটি সকল মাটির মানুষের কাছে মাতৃতুল্য পবিত্র সুতরাং মাটিকে ভালোবাস এবং নিজেকে মাটির মতো করে গড়ে তোলো তাহলে আল্লাহ তোমাদের পছন্দ করবেন